পুদিনার গুনাগুনঃ ডাঃ খন্দকার লুতফর রহমান।
পরিচিতি:
উদ্ভিদের নাম : পুদিনা
স্থানীয় নাম : পুদিনা
ভেষজ নাম : Menha Spicata
স্থানীয় নাম : Mint, Nana।
প্রজাতি: M. Spicata
ব্যবহৃত অংশ :
মূল, পাতা, কান্ড সহ সমগ্র গাছ
রোপনের সময় :
বছরের যে কোনো সময়।
মাটির ধরণ:
ভিজা পরিবেশে এবং আর্দ্র মাটিতে সবচেয়ে ভালো জন্মে।কান্ড সহ গাছটি ১৩ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
বৃক্ষ পরিচিতি:
ছোট গুল্ম জাতীয় বহু বর্ষজীবী গাছ। পাতা সবুজ, ডিম্বাকৃতি ও সুগন্ধী।
পুদিনা পাতা প্রাচীনকাল থেকেই বেশ জনপ্রিয় ভেষজ ওষুধ হিসেবে পরিচিত। বহু রোগে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পুদিনা পাতা এক ধরনের সুগন্ধি ভেষজ গাছ। এই গাছের পাতা তরি-তরকারির সঙ্গে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পুদিনার গাছ জন্মে। পুদিনা পাতায় ৩৭-৯৩% মেনথল পাওয়া যায়। যা বিভিন্ন পারফিউম, টুথ পেষ্ট, স্যম্পু ও সৌন্দর্য বর্ধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গাছের বর্ণনা:
পুদিনার ভূগর্ভস্থ রাইজোম থাকে ও কান্ড শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট। পাতা গাঢ় সবুজ অথবা সবুজাভ ধূসর বা সবুজাভ হলদেটে হয়। পাতার প্রন্তভাগ কাঁটা কাঁটা ও পরস্পর বিপরীতে জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে।পুস্পদন্ডে সাদা বা পার্পেল রঙের ফুল গুচ্ছাকারে আসে। চারটি অসমান লুব সহ ফুল দ্বিখন্ডিত। ছোট ফল ৪ টি বীজ ধারণ করে। জাতভেদে ১৩-৩৫ ইঞ্চি লম্বা হয় এবং বিস্তৃতি লাভ করে। দ্রুতবর্ধনশীল।
মাটি ও আবহাওয়া:
প্রায় সব মাটিতেই পুদিনা পাতার চাষ করা যায় তবে দো-আঁশ মাটিতে ভাল হয়। বিভিন্ন ধরণের আবহাওয়ায় বিভিন্ন ধরণের পুদিনার চাষ হয়। সাধারণত আর্দ্র আবহাওয়া ও আর্দ্র মাটিতে ভাল জন্মে। হালকা ছায়াযুক্ত স্থান ভাল হলেও পূর্ণ রোদ্রেও জন্মাতে পারে। কোন টব বা পাত্রেও চাষ করা যেতে পারে।
জাত:
প্রায় ৬০০ জাতের পুদিনা পাওয়া যায় যাদের অধিকাংশই প্যারিনিয়েল এবং কতিপয় একবর্ষজীবি। বিশ্বব্যাপি পিপারমিন্ট, স্পিয়ারমিন্ট ও আর্বেনেসিস জাতের পুদিনা বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশে জাপানিজ অরিজিন হল কমন।চাষাবাদের জন্য পুদিনার সবচেয়ে কমন ও জনপ্রিয় জাতসমূহ হচ্ছে পিপারমিন্ট, স্পিয়ারমিন্ট ও অ্যাপেলমিন্ট।
রোপনের সময়:
বছরের যে কোনো সময়ে রোপন করা যায়। বর্ষার আগে ও পরে চারা রোপণের নিয়ম। সে অনুযায়ী জুন অথবা অক্টোবর মাসে পুদিনার চারা রোপণ করা যেতে পারে।
জমি তৈরি:
জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরো করার পর চারা রোপণের আগে ৪০-৫৫সেন্টিমিটার চওড়া করে বেড তৈরি করতে হয়। বেডের উচ্চতা হবে ১৮-২২ সেন্টিমিটার। প্রতি বেডের মাঝে পানি নিষ্কাষণের নালা থাকবে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য বেডের আকার ১.৫ মিটার চওড়া ও ৫৫ মিটার লম্বা হবে।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি:
প্রতি হেক্টর জমি চাষের সময় মাটির সাথে ১২ থেকে ১৭ টন গোবর বা জৈবসার মিশিয়ে দিতে হয়। এটি চাষের জন্য অন্যান্য সারের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। তবে হাড়ের গুঁড়া ৫ কেজি, টিএসপি সার ১-১.৫ কেজি ও এমওপি সার ১ কেজি দেয়া যেতে পারে।এসব সার বেড তৈরির সময় বেডের মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
চারা রোপণের পদ্ধতি:
পুদিনা চাষ দু’ ভাবে করা হয়। কাটিং পদ্ধতি এবং শিকড় পদ্ধতি । কাটিং করে করলে বেশি সাফল্য পাওয়া যায়। ডাল ভেজা বা আদ্র মাটি পুতে রাখলেই এ গাছ জন্মে।কাটিং বা তেউড় লাগিয়ে চারা তৈরি করা হয়। কাটিংয়ের দৈর্ঘ্য হবে ১২ সেন্টিমিটার। জমিতে চারা রোপণের সপ্তাহখানেক আগে চারা তৈরি করতে হবে। বেডে ৩০-৩২ সেন্টিমিটার পরপর চারা রোপণ করা যেতে পারে। চারা রোপণের পর সেচ দিতে হবে। প্রতি দুই মাস পরপর প্রতি বর্গমিটারে ২৫ গ্রাম করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি ২/৩ বার কাটার পর একই নিয়মে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার দেয়ার পর সেচ দিতে হবে। বাণিজ্যিক জমিতে চারা রোপণের ১২-১৫ সপ্তাহ পর থেকে প্রতি মাসে একবার করে প্রতি বর্গমিটারে ২৫ গ্রাম করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে যেতে হবে।
ফসল সংগ্রহ:
একবার কয়েকটি গাছ রোপণ করলেই কিছুদিনের মধ্যে তা অনেক গাছে রূপান্তরিত হয়। তখন থেকেই পাতা সংগ্রহ করা যায়। পাতা সংগ্রহের সময় গাছের গোড়া বা শিকড়ের কোনো ক্ষতি না হয়।
অনেক নার্সারিতে পুদিনা পাতার গাছ পাওয়া যায়। এই গাছের একটি পুরানো ডাল শিকড়সহ কেটে টবে বা কন্টেইনারে রোপন করলেই কিছুদিনের মধ্যে ওই পাত্র পুদিনা পাতার গাছে ভরে যায়। তাই প্রথমদিকে ২/৩টি গাছ সংগ্রহ করলে আর কখনও চারার জন্য অন্য জায়গায় যেতে হয় না। কন্টেইনারে বা টবে লাগানো গাছগুলো প্রয়োজনে বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা যায় অথবা ছাদেও এর চাষ করা যায়। যারা শহরে থাকেন তারা ছাদে, বরান্দায় এবং বেলকনিতে এর চাষ করতে পারেন।
ভেষজ গুণাবলী:
১) রোদে পোড়া ত্বকের জ্বালা কমাতে পুদিনা পাতার রস ও অ্যালোভেরার রস এক সাথে মিশিয়ে ত্বকে লাগান। ১৫ মিনিট রেখে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন সানবার্নের জ্বালা গায়েব।
২)বহু বিজ্ঞানীদের দাবি, নিয়মিত পুদিনা পাতা ব্যবহার ক্যান্সার প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে। পুদিনা পাতার পেরিলেল অ্যালকোহল যা ফাইটো নিউট্রিয়েন্টসের একটি উপাদান দেহে ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে।
৩) ব্রণ দূর করতে ও ত্বকের তেলতেলে ভাব কমাতে তাজা পুদিনা পাতা বেটে ত্বকে লাগান। দশ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। ব্রণের দাগ দূর করতে প্রতিদিন রাতে পুদিনা পাতার রস লাগিয়ে কমপক্ষে ২/৩ ঘণ্টা রাখুন। তারপর ধুয়ে ফেলুন। মাসখানেক এইভাবে লাগালে ব্রণের দাগ উধাও হয়ে যাবে।
৪) চুলে উকুন হলে পুদিনার শেকড়ের রস লাগাতে পারেন। উকুনের মোক্ষম ওষুধ হল পুদিনার পাতা বা শেকড়ের রস। গোটা মাথায় চুলের গোড়ায় এই রস ভাল করে লাগান। এরপর একটি পাতলা কাপড় মাথায় পেঁচিয়ে রাখুন। এক ঘণ্টা পর চুল শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে অন্তত দু বার এটা করুন। এক মাসের মধ্য চুল হবে উকুনমুক্ত।
৫) সর্দি হলে নাক বুজে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো মারাত্মক কষ্ট পান অনেকেই। সেই সময় যদি পুদিনা পাতার রস খান, তাহলে এই কষ্ট থেকে রেহাই পাবেন নিমেষে। যাঁরা অ্যাজমা এবং কাশির সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের তাৎক্ষণিক উপশমে পুদিনা পাতা বেশ কার্যকরী। খুব বেশি নিঃশ্বাসের এবং কাশির সমস্যায় পড়লে পুদিনা পাতা গরম জলে ফুটিয়ে সেই জলেরর ভাপ নিতে পারেন। ভাপ নিতে অসুবিধা হলে গার্গল করার অভ্যাস তৈরি করুন।
৬) গোলাপ, পুদিনা, আমলকি ও শশার নির্যাস একসঙ্গে মিশিয়ে টোনার তৈরি করে মুখে লাগালে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে। মসৃণও হয়।
৭) পুদিনা পাতায় রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস, যা পেটের যে কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারে খুব দ্রুত। যাঁরা হজমের সমস্যা এবং পেটের ব্যথা কিংবা পেটের নানান সমস্যায় ভুগে থাকেন, তাঁরা খাবার কাওয়ার পর ১ কাপ পুদিনা পাতার চা খাওয়ার অভ্যাস করুন। ৬/৭টি তাজা পুদিনা পাতা গরম জলে ফুটিয়ে মধু মিশিয়ে খুব সহজে পুদিনা পাতার চা তৈরি করতে পারেন ঘরের মধ্যেই।
৮) গরমকালে শরীরকে ঠাণ্ডা রাখাতে পুদিনার রস খুব ভাল। গোসলের আগে জলের মধ্যে কিছু পুদিনা পাতা ফেলে রাখুন। সেই জল দিয়ে স্নান করলে শরীর ও মন চাঙ্গা থাকে।
৯) এই পাতার রস ত্বকের যে কোনো সংক্রমণকে ঠেকাতে অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ করে। শুকনো পুদিনা পাতা ফুটিয়ে পুদিনার জল তৈরি করে ফ্রিজে রেখে দিন। এক বালতি জলে দশ থেকে পনেরো চামচ পুদিনার জল মিশিয়ে স্নান করুন। গরমকালে শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া-জনিত বিশ্রী দুর্গন্ধের হাত থেকে রেহাই পেতে এটা ট্রাই করতে পারেন। কেননা পুদিনাতে রয়েছে অ্যাস্ট্রিনজেন্ট। ঘামাচি, অ্যালার্জিও হবে না।
১০) তাৎক্ষণিক যে কোনও ব্যথা থেকে রেহাই পেতে পুদিনা পাতার রস খুব উপকারী। চামড়ার ভেতরে গিয়ে নার্ভে পৌঁছায় এই রস। তাই মাথা ব্যথা বা জয়েন্টে ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে পুদিনা পাতা ব্যবহার করা যায়। মাথা ব্যথা হলে পুদিনা পাতার চা পান করতে পারেন। অথবা তাজা কিছু পুদিনা পাতা চিবিয়ে খেতে পারেন। জয়েন্টে ব্যথায় পুদিনা পাতা বেটে প্রলেপ দিলে ভালো ফল হয়।
তথ্য: সংগ্রহীত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন