নার্সিসিজম একটি জটিল মানসিক ব্যাধি। কিন্তু বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। একটি বেসরকারি সূত্রমতে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (Graduation level), নার্সিসিজমে ভোগা শিক্ষার্থীদের হার ০.৯% এর বেশি। স্বাভাবিক পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার খাতিরে আমাদের প্রতেকেরই উচিত এই নিরব মহামারি নার্সিসিজম সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা রাখা। আমি খুব সহজ বাংলায় লিখতে চেষ্টা করলাম। যারা লম্বা লিখা পড়তে আগ্রহী নন, তাদেরকে অনুরোধ করছি না পড়বার জন্য। শুরুতেই ভূমিকা হিসেবে একখানা চটকদার কাল্পনিক গল্পের অবতারণা করছি।
পুরোনো ঢাকার বিখ্যাত একটি মেডিক্যাল কলেজের একজন শিক্ষকের সাথে সেই কলেজেরই অষ্টাদশ ব্যাচের একজন ছাত্রীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। মেয়েটির পুরু কাচের চশমার ফ্রেমে ঢাকা গাম্ভীর্য স্যারের মন চুরি করে ফেলে। দুজনের মাঝে প্রথমে ঘোরাফেরা টাইপের এবং শেষ পর্যন্ত, বেশ গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। ....বর্তমান যুগে গভীর বলতে যা বুঝায় আর কি!!! মেয়েটির কিঞ্চিৎ শারীরিক শীতলতা (Frigidity) কে স্যার শুধুমাত্র নিষ্পাপতা ভেবে মনে মনে ব্যাপক প্রশান্তি লাভ করলেন। মেয়েটির অনুরাগ আর একগুয়েমিকে কিশোরীসুলভ চপলতা ভেবে স্যার মেয়েটিকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। কয়েকদিন বাদেই তাদের বিয়ের সানাই বাজবে। এমনই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হঠাত করেই স্যার আবিষ্কার করলেন যে, তার প্রেমিকা নার্সিসিজমে ভুগছেন। এই রোগের ধরণ সম্পর্কে তার ভালো ধারণা ছিলো। ব্যাপারটা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে এবং মেনে নিতে তার কিছুটা সময় লাগলেও, তিনি ব্যাপারটাকে স্বাভবিকভাবেই নিলেন। কারণ মেয়েটির প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। উনি মেয়েটিকে স্বাভাবিক করার জন্য চেষ্টা করলেন এবং রোগ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। কিন্তু তার ফল দাড়ালো, নিশ্চিত ঝগড়া। আর সব রোগির মত এই মেয়েটিরও মনে হলো স্যার তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন কিংবা বেশি অধিকার খাটানোর চেষ্টা করছেন। ব্যাক্তিস্বাধীনতা খর্ব হতে পারে ভেবে মেয়েটি সরাসরি সম্পর্ক ভেঙে দেয়ার হুমকি দিলো।
স্যার হাল ছাড়লেন না। তিনি মেয়েটিকে সুস্থ্য করার জন্য Nonpharmachological নানাধরনের পদ্ধতি প্রয়োগের চেষ্টা করলেন। এইবার মেয়েটির পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলো। স্যারের ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক হলো। তার পরিবার ও বন্ধুদের মেসেঞ্জারে তার আইডি থেকে আজে বাজে মেসেজ যেতে লাগলো। তার মোবাইলের সিমগুলোও কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো।
ততদিনে স্যারের কাধে ভর দিয়ে ছাত্রীটি সেকেন্ড প্রফেশনাল পরীক্ষা প্রায় উতড়ে গেছেন। কিছুদিন বিরতি দিয়ে স্যার আবার মেয়েটির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও তার সুস্থ্যতার জন্য চেষ্টা করলেন। এবার মেয়েটি স্যারের ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক করা অবস্থার কিছু মন গড়া মেসেজ নিয়ে সরাসরি স্যারকে ব্লাকমেইলর ভয় দেখালেন এবং সম্পর্ক ভেঙে দেবার জন্য চাপ প্রয়োগ করলেন। অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে স্যার সাহেব সম্পর্কের ইতি টানলেন।
একবছর পর তিনি জানতে পারলেন যে, সেই মেয়েটি কলেজের ভিতরের ও বাইরের একাধিক ছেলের সাথে নোংরা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন এবং খারাপ মেয়ে হিসেবে সবার কাছেই চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মনে অনেক কষ্ট নিয়ে জনাব স্যার সাহেব ব্যাপারখানা চেপে গেলেন। একটি প্রশ্নই তার মনে বারবার আসতে লাগলো। প্রশ্নটি হচ্ছে ,যে মেয়েটি তাকে শারিরিকভাবে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারে না, সে কিভাবে একাধিক ব্যাক্তির সাথে অনৈতিক সম্পর্ক করছে? একটুখামি নকল প্রশংসা ফাঁদে পড়ে কিভাবে একটি আপাত-বুদ্ধিমান মেয়ে এই ধরনের অন্যায় পথে চলে গেলো? কেনো এতো অদ্ভুত এই রোগ নার্সিসিজম!!
গ্রীক মিথোলজি অনুসারে, অপূর্ব সুন্দর ও প্রবল আত্মকেন্দ্রিক NARCISSUS, দেবি ECHOর প্রেম প্রত্যাখান করে অভিশাপগ্রস্থ হোন এবং নদীর জলে ভেসে উঠা নিজেরই প্রতিবিম্বের প্রতি কামাসক্ত হয়ে জলে ডুবে মারা যান। নিজের প্রতি অতিরিক্ত মোহের এই মানসিক ব্যাধিকে পরবর্তিতে NARCISSISM নামে অভিহিত করা হয়।
নার্সিসিজম শুধুমাত্র একটি মানসিক ব্যাধিই নয়। এর আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভুমিও রয়েছে। ছোট বেলা হতে চাইবার আগেই সবকিছু পেয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়েরা বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে এর শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে প্রবল আত্মকেন্দ্রিক, শিশুকালে স্নেহবঞ্চিত ও গোপন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার মানুষের মাঝে পরিণত জীবনে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই রোগের লক্ষনের মধ্যে প্রধান হচ্ছে, ১.নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবা ২.লজ্জাহীণতা ৩.উগ্রতা ৪.জনপ্রিয় মানুষকে হিংসা করা ৫.অন্যের নিকট অনুচিত দাবি করা ৫.অন্যের যোগ্যতা ও অনুভুতিকে অবমূল্যায়ন করা ৬.নিজের জীবনে জাদুকরী অলীক কিছু ঘটবেই, এই অন্ধবিশ্বাস রাখা। ৭.তোষামোদি পছন্দ করা ৮.সহযোগীতা ও সহমর্মিতা প্রকাশে অনিহা।
নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবার মধ্য দিয়ে এর সুত্রপাত হয়(ফার্স্ট ডিগ্রী)। রোগি নিজেকে ব্যাতীত কাউকেই পূরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন না। আশেপাশের সফল ও জনপ্রিয় লোকজনকে অপছন্দ করেন। মিথ্যে তোশামোদকারীরাই তার প্রিয় হন। নিজে যা ভালো বোঝেন, সকলের শত বারণ সত্তেও তাই করেন। অল্পতেই প্রায় সকলের সাথেই রাগ ও দুঃব্যাবহার করেন। অকপটে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করাকে স্বাভাবিক মনে করেন। নিজেকে সবার উপড়ে তুলতে যেয়ে নিকটজন ও নিজ পরিবারের লোকজনের গোপন নেতিবাচক তথ্যও অনায়াসে সবার সামনে প্রকাশ করেন। ফলে এদের পারিবারিক জীবন সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠে। পরিবার ও সম্পর্কের ব্যাপার এরা খুব উদাসিন থাকেন ও অধিকাংশই নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে পছন্দ করেন। সেকেন্ড ডিগ্রি নার্সিসিজমে ভোগা মেয়েরা, মেয়েলী স্বভাবের পুরুষ এবং ছেলেরা পুরুষালী মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে সেটা সাময়িক। থার্ড ডিগ্রিতে ভোগা রোগিরা সম্পুর্ণ নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেন। এই সময় অনেকের মধ্যে ক্লেপ্টোম্যানিয়া ও সিজোফ্রেনিয়া দেখা দেয়। ফলস্রুতিতে ধীরে ধীরে এরা সম্পুর্ন মানসিক রোগি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েন এবং নিজের ও আশেপাশে থাকা সকলের জীবনকে দূর্বিসহ করে তোলেন।
নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ইনভেন্টরি পদ্ধতির মাধ্যমে রোগের ডিগ্রি নির্ণয় করা যায়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ নার্সিসিজম কে খুব দূর্বল ভাবে দুই ধরণে ভাগ করেন। ১. EXHIBITIONIST( অতি উগ্র ও হিংসুক) ২.CLOSET(সব কিছুতেইপ্রশ্ন করা) । এই দুপ্রকার ছাড়া আরো কিছু উপবিভাগ থাকলেও সেগুলো খুব একটা মানা হয় না। কারণ এই রোগের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিস্তারকে একসাথে বিশ্লেষণ করা যায় না।
এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যাক্তির চিকিৎসায় ঔষধের ভুমিকা নগণ্য। খুব সল্প মাত্রায় ANXIOLYTIC DRUG কিছুটা কাজে আসে। তবে এদের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি সাইকোথেরাপি (BEHABIORAL & SOCIAL THERAPIES) দরকার। মানসিক,পারপ্বার্শিক ও সামাজিক ADAPTATION এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে এদের সুস্থ্য করে তোলা সম্ভব। সুতরাং আপনার আশেপাশে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হলে তাকে রোগের আদ্যোপান্তো জানাতে হবে এবং একজন সাইক্রিয়াটিস্টের অধীনে চিকিৎসা নেবার পরামর্শ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, উপেক্ষা নয় বরং সহমর্মিতা ও উপযুক্ত শিক্ষাই পারে যেকোনো মানসিক রোগ নির্মূল করতে। সবাইকে শুভেচ্ছা।
............... ডাঃ খন্দকার লুতফর রহমান।